দৃষ্টিপাত

ডেঙ্গু সমস্যার স্থায়ী সমাধানে মনোযোগ দিন

  প্রতিনিধি ৯ জুলাই ২০২৩ , ১:৩৫:২৩ প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ ভালো-এ কথাটি আমরা প্রায়ই বলে থাকি। কিন্তু মুখে যতই বলি না কেন, বাস্তবে আমরা তা প্রয়োগ করি না। কোনো কোনো রোগ বা আপদ-বিপদ আমাদের বিবেক-বুদ্ধিকে নাড়া দিয়ে যায়। আতঙ্কিত করে। তখন আমরা অনন্যোপায় হয়ে হলেও কিছুটা সচেতন হই। ডেঙ্গুর কথাই ধরা যাক। সাম্প্রতিককালে পত্রপত্রিকায় ভয়াবহ ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাবের কথা পড়ে, মৃত্যুর সংবাদ শুনে আমরা সবাই আতঙ্কিত হই।

এ রোগের প্রতিকার ও প্রতিরোধে কম-বেশি সবাই তৎপর হয়ে উঠি। ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে হলে মশা থেকে বাঁচতে হবে। তাই ছিটাও ওষুধ, মারও মশা। কিন্তু যতই ওষুধ ছিটানো হোক আর কামান দাগানো হোক, মশা কিন্তু খুব একটা মরছে না, মরলেও মরছে সামান্য ও সাময়িকভাবে। কারণ মশার ওষুধ অকার্যকর। আর এটি চিরস্থায়ী কোনো সমাধানও নয়। কয়েকদিন পর আবার মশা হবে। আবার ডেঙ্গু হবে, মানুষ মরবে।

মশা মারার জন্য আমরা ওষুধ ছিটানোর কথা বলছি, কিন্তু মশা প্রতিরোধের জন্য আমাদের পরিবেশ সংরক্ষণের কথা ক’জন বলছি? কর্তৃপক্ষই বা কী করছে? এ ঢাকা শহরসহ পুরো দেশটাকে নোংরা-আবর্জনাময় ও অস্বাস্থ্যকর করার পেছনে আমাদের সবার কম-বেশি অবদান রয়েছে। আমি বলি না, হাজার চেষ্টা করেও মশামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা যাবে। আমি মনে করি-আমরা সচেষ্ট হলে, যুক্তিসংগত আচরণ করলে, বিবেকবুদ্ধি খাটালে, বেশি স্বার্থপর না হলে, অন্যের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি মমত্ববোধ থাকলে, পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসচেতন হলে পরিস্থিতি অনেক নিয়ন্ত্রণে থাকত।

ডেঙ্গুজ্বরের নায়ক দুজন। এক মশা। নাম এডিস এজিপ্টি (aedes aegypti)। দ্বিতীয় নায়ক ভাইরাস। এতদিন মানুষ জানত মশার কামড়ে ম্যালেরিয়া হয়। এখন প্রায় সবাই জানে, মশার কামড়ে শরীরে ভাইরাস সংক্রমিত হলে ডেঙ্গুজ্বর হয়। ডেঙ্গুজ্বরের উপসর্গের মধ্যে রয়েছে তীব্র জ্বর। তাপমাত্রা ১০৩-১০৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট। জ্বর থাকে ৫-৭ দিন। প্রথম ২-৩ দিন ধরে জ্বরের উপসর্গ বাড়তে থাকে। এরপর একটু অবদমিত হয়। তারপর চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে আবার উপসর্গ বৃদ্ধি পায়। মাথাব্যথা, চোখব্যথা, শরীরের বিভিন্ন অস্থি গ্রন্থিতে প্রদাহ এবং প্রচণ্ড ব্যথা, মাংসপেশির ব্যথা তীব্র হবে। জ্বরে গলা ফুলে যেতে পারে।

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত খুব অল্পসংখ্যক রোগী (শতকরা ১-২ ভাগ) হেমোরেজিক জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে। অনেকেরই ধারণা, ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত সব রোগী হেমোরেজিক জ্বরে আক্রান্ত হয়। এ ধারণা ঠিক নয়। মশার কামড়ের ৫-৭ দিনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বরের উপসর্গগুলো দৃশ্যমান হবে। সংক্রমণের জন্য দায়ী ভাইরাসের ইনকিউবেশন সময় (রোগ সঞ্চার থেকে প্রথম রোগের লক্ষণ দেখা দেওয়া পর্যন্ত কাল) হলো ৫-৭ দিন। এজন্য ৫-৭ দিন অপেক্ষা না করে তড়িঘড়ি করে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা করা হলে তাতে কিছুই বোঝা যাবে না। ডেঙ্গুজ্বরে তীব্র ব্যথা-বেদনা ছাড়া অন্য কোনো উপসর্গ থাকে না। কিন্তু হেমোরেজিক জ্বরে মারাত্মক কিছু উপসর্গ দেখা যায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর ও ব্যথা-বেদনা ছাড়াও পেটে তীব্র ব্যথা, নাক-মুখ ও দাঁতের মাড়ি থেকে রক্তক্ষরণ, রক্ত বমি, কালো কয়লার মতো পায়খানা ইত্যাদি।

ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীকে সজাগ দৃষ্টিতে রাখা বাঞ্ছনীয়। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষরণের উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ডেঙ্গুজ্বর হেমোরেজিক জ্বরে রূপান্তরিতে না হলে ভয়ের বিশেষ কারণ নেই। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, এক্ষেত্রে জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ২-৩ দিনের মধ্যে রক্তক্ষরণের উপসর্গ পরিলক্ষিত হয়। শিশুদের জন্য হেমোরেজিক জ্বর ভয়ংকর হতে পারে। হেমোরেজিক ডেঙ্গু ফিভারে শিশুর মৃত্যুহার বেশি।

ডেঙ্গুজ্বর ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে বলে এর প্রতিকারে কোনো ওষুধ কার্যকর নয়। তাই ডেঙ্গুজ্বরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার একদম অযৌক্তিক। জ্বর ও ব্যথা-বেদনার জন্য সচরাচর অ্যাসপিরিন প্রয়োগের বিধান থাকলেও ডেঙ্গুজ্বরের ক্ষেত্রে অ্যাসপিরিন ব্যবহার নিষিদ্ধ। কারণ, অ্যাসপিরিন ও আইবোপ্রুফেন জাতীয় ওষুধগুলো রক্তক্ষরণের প্রবণতা ও মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর ফলে অবস্থার আরও অবনতি ঘটতে পারে। আমাদের মনে রাখা উচিত, সব রোগে ওষুধের প্রয়োজন হয় না। বরং কোনো কোনো রোগের বেলায় ওষুধ প্রয়োগ করলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। তবে হেমোরেজিক জ্বরের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুজ্বরে রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে এবং প্রচুর পানীয় পান করতে দিতে হবে।

২.

মশা ম্যালেরিয়ার বাহক আবার মশা ডেঙ্গু ভাইরাসেরও বাহক। কোন মশা কোন রোগের বাহক, তা আপাতদৃষ্টিতে জানা মুশকিল। আবার কোন মশা ভাইরাসের বাহক, আবার কোনটি নয়, তা-ও জানা সম্ভব নয়। তাই সব মশাই আমাদের শত্রু। সব মশাই আমাদের টার্গেট। তাই ‘যেখানেই মশা পাও, সেখানেই মশা তাড়াও। মশা সমূলে বিনাশ করো’-এই হোক আমাদের স্লোগান। এতে সুবিধা দ্বিমুখী। ম্যালেরিয়ার মশা, ডেঙ্গুর মশা সবই নির্বংশ হবে। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে এ ভাইরাস অন্য সুস্থ লোকের দেহে বহন করে নিয়ে সংক্রমিত করে এডিস মশা। তাই সংক্রমণ বন্ধ বা প্রতিরোধ করার জন্য ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা অতি জরুরি। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীকে না কামড়ালে এবং মশা ডেঙ্গু ভাইরাস বহন না করলে তার কামড়ে ডেঙ্গু হওয়ার আশঙ্কা নেই।

মশা কোথায় জন্মায়, কীভাবে এর বংশবিস্তার ঘটে-এসব আমরা অনেকেই জানি। তারপরও প্রসঙ্গক্রমে বলা প্রয়োজন, মশা ঘরবাড়ির আনাচে-কানাচে জমে থাকা পানিতে ডিম পাড়ে। মশার ডিমপাড়ার উপযোগী জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে-পানিসমৃদ্ধ ড্রাম, মাটির ভাঙা হাঁড়িপাতিল বা তার ভগ্নাংশ, বিভিন্ন ছোট-বড় পাত্র, বালতি, ফুলের টব, ফুলদানি, পরিত্যক্ত বোতল, টায়ার, পলিথিন ব্যাগ, ছোট-বড় গর্ত, নালা, পুকুর ইত্যাদি। ডেঙ্গুজ্বর প্রতিরোধে যেসব স্থানে মশা জন্মায় এবং বংশবিস্তার করে সেসব স্থান পরিষ্কার-পরিছন্ন করে ফেলতে হবে। জলাবদ্ধ জায়গা শুকিয়ে ফেলতে হবে। প্রয়োজনমতো মশার ওষুধ ছিটাতে হবে। পরিবেশদূষণ থেকে বিরত থাকতে হবে, অন্যকেও বিরত রাখতে হবে। এ পদক্ষেপগুলো বর্ষা শুরুর আগে ও পরে করাটা উত্তম।

ডেঙ্গুজ্বরের প্রাদুর্ভাব দেখা যায় যেসব দেশে, সেগুলো হলো- সাউথ প্যাসিফিক, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল, পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ, জাপান ইত্যাদি।

পরিশেষে ডেঙ্গুজ্বর সম্পর্কিত কিছু পরামর্শ উপস্থাপন করছি : ১. এডিস মশা মানুষকে সাধারণত দিনে কামড়ায়। তাই দিনের বেলায় মশার কামড় থেকে নিজকে রক্ষা করে চলুন; ২. ঘরদুয়ারে বা কর্মস্থলে মশা তাড়ানোর জন্য রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন; ৩. বাজার থেকে মশার কয়েল এনে দিনেও ব্যবহার করা যেতে পারে; ৪. দিনে ঘুমাতে চাইলে মশারি খাটিয়ে ঘুমানো উচিত; ৫. মশা ধ্বংসের জন্য উপযোগী জীবাণুনাশক বাজারে পাওয়া যায়। এগুলো ব্যবহার করে মশা তাড়ানো বা ধ্বংস করা সম্ভব; ৬. ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করুন। তা না হলে মশায় আক্রান্ত রোগীর দেহ থেকে ভাইরাস সুস্থ মানুষের দেহে ছড়াতে পারে;

৭. বাসস্থানের আশপাশে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণে সচেষ্ট হোন। আবদ্ধ পানি সরিয়ে বা শুকিয়ে ফেলুন। ময়লা-আবর্জনা বা ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফেলুন। এসব জায়গায় মশা লুকিয়ে থাকে; ৮. সিটি করপোরেশন বা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন। মশা নির্মূলে তাদের সাহায্য নিন এবং তাদের প্রয়োজনমতো সাহায্য দিন। নিজেও কিছু টাকা খরচ করে এ কাজটি করতে পারেন এবং মশার ওষুধ ছিটাতে পারেন। ওষুধ না পেলে কেরোসিন ছিটিয়ে দিন জলাবদ্ধ জায়গায়; ৯. ডেঙ্গুজ্বরের রোগীকে সজাগ দৃষ্টিতে রাখা উচিত। শিশুর ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা বাঞ্ছনীয়। রোগাক্রান্ত শিশুর অবস্থার অবনতি দ্রুত হয়;

১০. অবস্থার অবনিত দৃষ্টিগোচর হলে দেরি না করে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করুন এবং সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করুন; ১১. বাড়ির ছাদ বা বারান্দার ফুল বা গাছের টবে জমে থাকা পানি মশা জন্মানোর উপযুক্ত স্থান। টবে পানি জমতে দেবেন না; ১২. ময়লা পানিতে মশা জন্মায় না, পরিষ্কার পানিতে জন্মায়-এ কথাটি সত্য নয়। সবাই সুস্থ থাকুন, অন্যকে সুস্থ রাখুন।

ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ : প্রফেসর ও বিভাগীয় প্রধান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

drmuniruddin@gmail.com