ইসলাম ও জীবন

মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক প্রবাজপুর শাহী মসজিদ

  প্রতিনিধি ৮ মার্চ ২০২৫ , ৭:১৪:১৫ প্রিন্ট সংস্করণ

আসাদুজ্জামান সাতক্ষীরা:

কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের এক অনন্য নিদর্শন ঐতিহাসিক প্রবাজপুর শাহী মসজিদ। সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকলেও প্রতিদিন শত শত মুসল্লী এখনো এই মসজিদে নামাজ পড়তে আসেন। মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন লাল রঙের মসজিদটি দেখতে দূর দূরান্ত থেকে আসেন পর্যটকও।

প্রত্নতাত্ত্বিক বিশারদদের মতে, মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এই এলাকায় তার রক্ষিত মুসলমান সৈন্যদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায়ের জন্য প্রধান সেনাপতি সুবেদার পরবাজ খাঁকে একটি মসজিদ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। এই নির্দেশ পাওয়ার পর তিনি এই এলাকায় যমুনা নদীর তীরে মসজিদটি নির্মাণ করেন। জানা যায়, ০২ মে ১৬৯৩ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মিত হয়।

যে গ্রামটিতে তার সৈন্যরা থাকতো পরবাজ খাঁ’র নামানুসারে সেই গ্রামটির নামকরণ করা হয় প্রবাজপুর গ্রাম।

পরবর্তীতে মসজিদ নির্মাণ করার পর মসজিদটির নামকরণও হয় ‘প্রবাজপুর শাহী মসজিদ। মসজিদটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ফৌজদার নবাব নুরুল্লাহ খাঁ এ মসজিদের নামে লাখেরাজে ৫০ বিঘা জমি দান করেন। তবে, এমনও প্রচারণা আছে যে, জঙ্গল কেটে পরিষ্কার করে রাতারাতি নাকি জ্বিনেরা মসজিদটি তৈরি করে ছিলো।

এই মসজিদটির বাহ্যিক কাঠামোয় দৈর্ঘ্য ৫২ ফুট ৫ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ৩৯ ফুট ৮ ইঞ্চি। মসজিদটির ভেতরে ২১ ফুট ৬ ইঞ্চির বর্গাকৃতির একটি নামাজের জায়গা রয়েছে। মসজিদের দেয়াল গুলো ৫ ফুট ৯ ইঞ্চি থেকে ৭ ফুট পুরু। আর মসজিদের প্রধান দরজাটি ৪ ফুট ৭ ইঞ্চি প্রশস্ত। মসজিদটিতে ৬ ফুট ৯ ইঞ্চি প্রশস্ত একটি বারান্দা ছিল যা এখন আর নেই। মসজিদটিতে মোট ১০টি দরজা থাকলেও বর্তমানে দরজার নিচের অংশে পাতলা প্রাচীর নির্মাণ করে জানালার আকৃতি করা হয়েছে।

তিনটি অলংকৃত মেহরাবও রয়েছে মসজিদটিতে। চার গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী হিসেবে এখনো সবার নজর কাড়ে। ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে মসজিদটি ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন অনুযায়ী স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগের তত্ত্বাবধানে আছে।

স্থানীয়রা জানান, মুঘল আমলে নির্মিত প্রবাজপুর শাহী মসজিদে স্থানীয় মুসল্লিরা ছাড়াও বহু ভক্ত ও দর্শনার্থীরা এখানে নিয়মিত ওয়াক্তের নামাজ এবং জুম্মার নামাজ আদায় করেন। প্রাচীন এই মসজিদের অবকাঠামো দিনদিন অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশেষ করে গত কয়েক বছর যাবৎ একের পর এক বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে মসজিদটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মসজিদটির সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। মুসলিম স্থাপত্য শিল্পের ধারক ও বাহক মসজিদটি দেখার জন্য দেশ ও দেশের বাইরের অনেক পর্যটক এখনও সেখানে ভিড় করেন।

স্থানীয় বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক আলহাজ মমতাজ হোসেন মন্টু জানান, মুঘল শাসনামলে  প্রধান সেনাপতি প্রবাজ খাঁ এই বাংলার বুকে আসেন। তার অধীনে থাকা সকল মুসলিম সৈন্যদের থাকা খাওয়া ও নামাজের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়ায় মসজিদটি নির্মাণ করা হয় এবং তার নামেই নামকরণ করা হয় প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ। এখানে জুম্মার নামাজসহ ৫ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়। বর্তমানে নুরুল্লাহ খাঁ স্টেটের অধীনে এবং প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মসজিদটি পরিচালিত হয়।

প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ মাখলুকাত ইসলাম জানান, মসজিদটির অধিকাংশ জমি বেদখল হয়ে গেছে। মসজিদের মূল ভবন ও মাদ্রাসাসহ মাত্র তিন বিঘা জমি দখলে রয়েছে। বাকী জমিসব প্রতিপক্ষরা জালজালিয়াতি করে রেকর্ড করে নিয়েছে। এটি নিয়ে মামলাও চলমান রয়েছে হাইকোর্টে। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে মসজিদটির সংস্কার কাজ চলমান রয়েছে। সূত্র:বাসস

আরও খবর

Sponsered content