জীনাত তাজনীন
এই উপমহাদেশের মানুষ শিক্ষা, সংস্কৃতি, সততা, মানবিকতা ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে সত্যিকার অর্থে কতোটা মানুষ হয়ে উঠতে পেরেছে সে প্রশ্ন আজও আমাকে গভীরভাবে ভাবায়।
আমরা মানুষ হওয়ার কথা বলি, নীতি-নৈতিকতার কথা বলি, ধর্ম ও আদর্শের কথা বলি; কিন্তু আমাদের ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে সেই মানবিকতার প্রতিফলন কতটুকু?
আমাদের অধিকাংশ মানুষ যেনো নিজ নিজ ধর্মীয় পরিচয়ের বৃত্তেই বন্দি। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিস্টান।
অথচ এই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আমাদের আরও একটি মৌলিক পরিচয় রয়েছে আমরা মানুষ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই মানবিক পরিচয়টিই অনেক সময় ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে হারিয়ে যায়।
আমার চারপাশে তাই যখন মানুষের দিকে তাকাই, তখন অনেক সময় মানুষকে দেখি না; দেখি ধর্মীয় পরিচয়ে বিভক্ত একেকটি গোষ্ঠী। দেখি বিশ্বাসের অহংকার, পরিচয়ের সংঘাত, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতা।
অথচ মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার ধর্মীয় পরিচয়ে নয়, তার মনুষ্যত্বে; তার বিশ্বাসের ঘোষণায় নয়, তার জীবনাচরণে।
একজন মানুষ কতোটা ধার্মিক, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তিনি কতোটা সৎ, কতোটা বিবেকবান, কতোটা পরার্থপর এবং অন্য মানুষের কল্যাণে কতোটা নিবেদিত?
তাঁর মধ্যে যদি সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ না থাকে তাহলে তাঁর ধর্মীয় পরিচয় সমাজের কী উপকারে আসে?
যে সমাজে স্বার্থপরতা লোভ লালসা প্রতারণা লুণ্ঠন ঘুষ ও দুর্নীতিকে মানুষ ক্রমশ স্বাভাবিক জীবনাচরণের অংশ হিসেবে মেনে নিতে শেখে সেখানে নৈতিকতার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যের অধিকার হরণ করেও যখন মানুষ অপরাধবোধে ভোগে না, অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেও যখন নিজেকে অপরাধী মনে করে না তখন বুঝতে হবে সংকট কেবল আইন কিংবা প্রশাসনের নয় সংকট আমাদের বিবেক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্বেরও।
অবশ্য এই সংকটের দায় কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার প্রকৃত কারণ বোঝা যাবে না।
ধর্মের অনুসারী হয়েও মানুষ মানবিক হতে পারেন, আবার ধর্মীয় পরিচয় ছাড়াও কেউ নৈতিক ও মানবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
মূল প্রশ্নটি ধর্মে বিশ্বাস করা কিংবা না-করার নয়; মূল প্রশ্ন হলো মানুষ তার বিশ্বাস ও আদর্শকে কতোটা সততা ন্যায়বোধ এবং মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করতে পেরেছে।
আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের সংকট আরও গভীর হয় যখন রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে সৎ যোগ্য বিবেকবান ও জনকল্যাণকামী মানুষের অবস্থান নিশ্চিত হয় না।
যখন ব্যক্তিস্বার্থ জনস্বার্থকে গ্রাস করে ক্ষমতা সেবার পরিবর্তে আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয় এবং নেতৃত্বের কাছে নৈতিকতার চেয়ে ব্যক্তিগত লাভ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অবক্ষয় দীর্ঘস্থায়ী হয়।
এই পরিস্থিতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম চলতে পারে, এমনকি শতাব্দীর পর শতাব্দীও যদি না সমাজের মানুষ নিজেদের চিন্তা, মূল্যবোধ ও আচরণ পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয়।
কিন্তু অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে আমাদের নিজেদের দিকেও তাকানো প্রয়োজন।
আমরা যতো নীতিকথাই বলি না কেন, প্রত্যেকে কি নিজের বুকে হাত রেখে বলতে পারি আমি কতোটা সৎ, কতোটা নির্লোভ, কতোটা ন্যায়পরায়ণ এবং কতোটা মানবহিতৈষী?
আমি কি সত্যিই নিজের স্বার্থের চেয়ে অন্যের কল্যাণকে বেশি গুরুত্ব দিই?
অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিজের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আমি কি একইভাবে প্রতিবাদ করতে পারি?
সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অন্যায় সুবিধা গ্রহণ না করার মতো নৈতিক দৃঢ়তা কি আমার রয়েছে? এই আত্মজিজ্ঞাসাগুলো জরুরি।
কারণ সমাজের পরিবর্তন কেবল অন্যের চরিত্র সংশোধনের দাবি জানিয়ে আসে না; পরিবর্তনের সূচনা ঘটে নিজের বিবেকের মুখোমুখি দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।
আমরা যদি নিজের জীবনে সততা প্রতিষ্ঠা করতে না পারি, নিজের স্বার্থপরতাকে প্রশ্ন করতে না শিখি, তবে অন্যের কাছে নৈতিকতা দাবি করার অধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমাদের রাজনীতিক, নীতিনির্ধারক ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যেও যদি আত্মসমালোচনা, পরার্থপরতা এবং জনকল্যাণের চেতনা কার্যকর হয়, যদি তাঁদের সিদ্ধান্ত ও দৈনন্দিন আচরণে সততা এবং জবাবদিহির প্রতিফলন ঘটে, তবেই সমাজের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের পথ প্রশস্ত হবে।
রাষ্ট্রের অগ্রগতি শুধু অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা উন্নয়নের পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রকৃত অগ্রগতি তখনই সম্ভব, যখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা, নৈতিক মূল্যবোধ এবং মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধও বিকশিত হয়।
আর এই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ এবং বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।
শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল সনদ অর্জন কিংবা জীবিকা নির্বাহের যোগ্যতা তৈরি করা নয়।
শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য মানুষকে যুক্তিবাদী, বিবেকবান, প্রশ্নশীল, দায়িত্বশীল ও মানবিক করে তোলা।
যে শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় না, যুক্তি দিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শেখায় না, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত হওয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক সাহস জোগায় না, সেই শিক্ষা মানুষের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে না।
ধর্মীয় গোঁড়ামি ও মধ্যযুগীয় চিন্তার অনুকরণে পরিচালিত এমন কোনো শিক্ষাব্যবস্থা, যা মুক্তবুদ্ধি, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে, তা দিয়ে আধুনিক, উদার ও বিবেকবান সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
তবে ধর্মীয় শিক্ষার বিরোধিতা করাই এখানে মূল উদ্দেশ্য নয়; বরং যে কোনো শিক্ষার ক্ষেত্রেই যুক্তিবোধ, মানবিকতা, সহনশীলতা ও জ্ঞানচর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।
আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান নয়, মানুষের যোগ্যতা, যুক্তিবোধ, সততা ও মানবিক মর্যাদা গুরুত্ব পাবে; যেখানে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, সত্যকে অনুসন্ধান করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানুষের কল্যাণে নিজেদের নিয়োজিত করতে শিখবে।
কারণ, জ্ঞান ছাড়া মুক্তচিন্তা বিকশিত হয় না, মুক্তচিন্তা ছাড়া বিবেকের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয় না, আর বিবেকের স্বাধীনতা ছাড়া প্রকৃত মানবিক সমাজ নির্মাণ করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি খুব সহজ, অথচ গভীর আমরা কে, আমাদের ধর্ম কী, আমাদের পরিচয় কী এসবের আগে আমরা কি সত্যিকার অর্থে মানুষ হতে পেরেছি?
যেদিন ধর্মীয় পরিচয়ের অহংকারের চেয়ে মানুষের মর্যাদা বড় হবে, ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে পরার্থপরতা গুরুত্বপূর্ণ হবে, ক্ষমতার চেয়ে ন্যায়বিচার এবং আনুগত্যের চেয়ে সত্যের মূল্য বেশি হবে, সেদিনই এই উপমহাদেশে প্রকৃত মানবিকতার বিকাশ ঘটবে।
আমার বিশ্বাস, মানুষের মুক্তি কেবল পরিচয়ের পরিবর্তনে নয়, চেতনার পরিবর্তনে; কেবল ধর্মীয় আচার পালনে নয়, মানবিক দায়িত্ব পালনে; কেবল নীতিকথা উচ্চারণে নয়, নিজের জীবনে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগে।
আমাদের প্রথম পরিচয় মানুষ, আর সেই পরিচয়ের সার্থকতা মনুষ্যত্বে।