এস এম মিজান ও নূরুল আজিজ চৌধুরী
প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করার নির্দেশনা দেওয়া হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বুধবার ‘আর্তনাদ’ নামে আরেকটি স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু।
এর আগে ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানের স্মরণে ‘নির্ভীক জুলাই’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছিল ডাকসু।
দুটি স্মৃতিস্তম্ভের কোনোটি নির্মাণের ক্ষেত্রেই প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ডাকসুর সংস্কারকৃত সংগ্রহশালায় ভাষা আন্দোলনের ঘটনার সূত্রে পাকিস্তানের জাতির জনক মুহম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি রাখা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
একই সঙ্গে সংগ্রহশালা থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উল্লেখযোগ্য ছবি অপসারণের কারণে বিষয়টি বেশ আলোচিত হয়।
তখন গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘নির্ভীক জুলাই’-এর বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. ইসরাফিল রতন সাংবাদিক দের কে বলেন, ‘এ (আর্তনাদ) স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো ধরনের অনুমোদন নেওয়া হয়নি।
ডাকসু যা করছে, তা দ্বৈত প্রশাসনের মতো মনে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যদি একটি পক্ষ প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে, তাহলে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো ও শৃঙ্খলা দুটোই প্রশ্নের মুখে পড়ে।’ প্রক্টর আরও বলেন, ‘ডাকসু ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠন।
তাদের কাজ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ নিয়ে কাজ করা, তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া প্রশাসনের কাছে তুলে ধরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখা।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তারা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে বা অনুমোদন ছাড়া স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে।...বিশ্ববিদ্যালয় তো এভাবে চলতে পারে না যে একটি পক্ষ প্রশাসনের বাইরে গিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই করবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিবিধানে ক্যাম্পাসের সম্পত্তি ও ছাত্র সংসদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কাঠামো রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর অনুচ্ছেদ ২৪ (ক) অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি ও তহবিল ধারণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিন্ডিকেটের ওপর ন্যস্ত।
একইভাবে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্স অ্যান্ড রেগুলেশনসের চতুর্দশ অধ্যায়ের ৪ নম্বর ধারার নোট অনুযায়ী, ছাত্র সংসদকে যেকোনো সিদ্ধান্ত উপাচার্যের নির্দেশনা সাপেক্ষে নিতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, এ বিধানের কারণে ক্যাম্পাসে স্থাপনা নির্মাণের মতো বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া ডাকসুর একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই।
সংগ্রহশালাসহ নানা কাজে প্রতিক্রিয়া ডাকসু সংগ্রহশালার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগ কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ডাকসুর সাম্প্রতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত আইন, বিধি, নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ডাকসু সংগ্রহশালায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এতে আরও বলা হয় ডাকসুর পক্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মূল্যায়নের জন্য অনুমোদন ছাড়া ওয়েবসাইট চালু করার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
উপাচার্য এম ওবায়দুল ইসলাম তখন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জিন্নাহ এবং আবদুল মালেকের ছবি রাখা এবং ক্যাম্পাসে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপনের বিষয়েও তদন্ত করা হবে।
বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন এবং জুলাই আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ‘শিক্ষক নেটওয়ার্ক’ও জিন্নাহর ছবি রাখা এবং ১৯৫২ ও ১৯৭১-এর গৌরবোজ্জল ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ ছবি সংগ্রহশালায় না থাকার নিন্দা করেছিলেন।
বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-মোজাদ্দেদী আলফেসানী সাংবাদিক।দের বলেন, ‘তারা (ডাকসু) বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিবিধান মানেনি।
তবে আমরা বিধিবিধান না মেনে কোনো কিছু করতে চাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান অনুযায়ী তাদের (ডাকসুর) বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’