আ জা ডেক্স
জাপানের উন্নয়নের বীজ বপন করে দিয়ে গিয়েছিলেন সম্রাট মেইজি। ১৮৬৮ সালে সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি যে কথাটি বলেছিলেন তা কেবল জাপানের জন্য নয় বরং সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি জাতির জন্য আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
তিনি বলেছিলেন- যদি দেশের মানুষ সারাবছর আন্দোলন, সংঘাত আর বিভাজনের মধ্যেই ব্যস্ত থাকে তবে দেশ গড়বো কখন? উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে জাপান যেন ছিল সময়ের বাইরে ঘুমিয়ে থাকা এক দ্বীপ। সামন্ত প্রভুদের পারস্পরিক সংঘাত, ক্ষমতার লালসা আর অরাজকতায় তখন গোটা সমাজ পঙ্গু। সামুরাই প্রভুরা শাসন করতো, কৃষকরা পরিশ্রমে ন্যুব্জ আর বেকারেরা লুঠতরাজে ব্যস্ত ।
সমৃদ্ধি আর শৃঙখলার কোনো চিহ্নই জাপানে ছিলো না। কিন্তু সেই নিদ্রাভঙ্গ হলো ১৮৫৩ সালে যখন মার্কিন কমোডর ম্যাথিউ পেরি তাঁর কালো ধোঁয়া ছড়ানো বাষ্পচালিত যুদ্ধজাহাজ নিয়ে জাপানের উপকূলে এসে উপস্থিত হলেন। কামানের গর্জন যেন জাপানের অন্তঃকলহে নিমজ্জিত জাতির কানে এক সতর্ক ঘণ্টা বাজিয়ে দিলো। জাপান হঠাৎ উপলব্ধি করলো পশ্চিমা বিশ্ব অনেক দূরে এগিয়ে গেছে।
আর তারা এখনো পিছিয়ে আছে অতীতের অন্ধকারে। এই ধাক্কাই ছিল জাপানের জাগরণের সূচনা। আর সেখান থেকেই জন্ম নিল ইতিহাসের মোড় ঘোরানো এক সিদ্ধান্ত। ১৮৬৮ সালের সম্রাট মেইজির জাপান সংস্কার। সম্রাট মেইজি সিংহাসনে আরোহণ করে ঘোষণা দিলেন দেশের সমস্ত অরাজকতার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন যুগের সূচনা করতে হবে। যেমন কথা তেমনি কাজ। কয়েক দশকের মধ্যেই জাপান রূপান্তরিত হলো এক সামন্ত দ্বীপপুঞ্জ থেকে আধুনিক শিল্পোন্নত রাষ্ট্রে। পুরো দেশব্যাপী শুরু হলো সম্রাটের কঠোর সুশাসন। সামুরাইরা যারা তলোয়ার নিয়েই ব্যস্ত থাকতো তাদের নিয়ে গড়ে তোলা হলো দক্ষ সেনা এবং পুলিশ বাহিনী।
সামুরাইরা তাদের তলোয়ার নামিয়ে রেখে হয়ে গেলো সেনা, পুলিশ অফিসার ও প্রশাসক। দেশের আইন শৃংখলা রক্ষায় সম্রাটের কঠোর নির্দেশে জারি হলো। জাপান যেন জেগে উঠল এক নতুন কর্মশক্তিতে। যোগাযোগ ব্যবস্থায় আসলো আমূল পরিবর্তন।কাঠের প্রাসাদের জায়গায় উঠল কলকারখানা। গ্রামীণ অবকাঠামো পেলো আধুনিকতার স্পর্শ। শিক্ষাকে করা হলো বাধ্যতামূলক, মাদক নিষিদ্ধ হলো আর তরুণদের পাঠানো হলো ইউরোপ ও আমেরিকায় আধুনিক শিক্ষা অর্জনের জন্য।
তারা ফিরে এসে চিকিৎসা, প্রকৌশল ও সামরিক বিদ্যার আলোয় আলোকিত করলো নিজেদের দেশকে। সমস্ত রকমের দূর্নীতি এবং স্বজনপ্রীতির দ্বার জাপানে চিরদিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হলো। জাপান ইউরোপ আমেরিকা থেকে প্রযুক্তিগত সমস্ত ভালো দিকগুলো গ্রহণ করলো। সম্রাট মেইজির ঘোষণা ছিলো-এটা জাপানের পশ্চিমের প্রতি আত্মসমর্পণ নয় বরং বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে যা কল্যাণকর তা গ্রহণ। আর যা জাপানের সংস্কৃতির বিরোধী তা বর্জন। এটা ছিলো বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে অগ্রগতির পথে হাঁটার জাপানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। যারা সবসময় আন্ত কলহ আর দ্বন্ধে মগ্ন থাকতো তার এক নতুন জাতি হিসাবে পৃথিবীতে আবির্ভূত হলো। তারা দেশের স্বাধীনতা , সার্বভৌমতত্বকেও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করলো।
এরপর ১৮৯৪–৯৫ সালে চীনের বিরুদ্ধে এবং ১৯০৪–০৫ সালে রুশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করে জাপান প্রমাণ করলো তারা পূর্ব দিক থেকে উঠে আসা এক নতুন পরাশক্তি। জাপান আর কোনো পিছিয়ে পড়া বিশৃংখল জাতি নয়। সম্রাট মেইজির জাপান সংস্কার পৃথিবীকে এক অমূল্য শিক্ষা দিয়ে গিয়েছে। একটি জাতি যদি মনপ্রাণ দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়, শৃঙ্খলা ও জ্ঞানের আলোয় নিজেকে গড়ে তোলে, আপোষহীন নীতি আর আদর্শ মেনে চলে তবে হাতের তলোয়ার ছেড়ে দিয়ে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, আস্তাবল কারখানায় রুপান্তরিত হতে পারে, সামন্ত রাজ্য আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
এমনকি বিশৃংখল একটা জাতি কয়েক দশকের মাঝে পৃথিবীতে নেতৃত্বের আসনেও পৌঁছাতে পারে। লেখক:আরিফ মাহমুদ।