জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
মরুভূমির বুকজুড়ে তখন হাহাকার করছিল এক তৃষ্ণার্ত সভ্যতা।
ষষ্ঠ শতাব্দীর আরব উপদ্বীপে সূর্যের প্রখরতার চেয়েও তীব্র ছিল মানবতার সংকট। ইতিহাসের পাতায় এই যুগকে চিহ্নিত করা হয়েছে ‘জাহিলিয়াত’ নামে—অজ্ঞতা আর অন্ধকারের যুগ হিসেবে।
সেই সময়ের আরব সমাজের দিকে তাকালে মনে হয়, যেন মানবতা নিজেই নির্বাসনে চলে গিয়েছিল বহুদূরে।
গোত্রে গোত্রে বিভক্ত আরব সমাজে তখন রক্তের প্রতিশোধই ছিল একমাত্র আইন।
সামান্য একটি উটের কারণে শুরু হওয়া যুদ্ধ চলত চল্লিশ বছর ধরে, যেমনটি ঘটেছিল বিখ্যাত ‘হারবুল বাসুস’ যুদ্ধে।
কাবাঘরের চারপাশে দাঁড়িয়েছিল ৩৬০টি প্রতিমা। মানুষ পাথর ও কাঠ খোদাই করে নিজ হাতে উপাস্য তৈরি করত, আবার নিজেরাই তার সামনে মাথা নত করত।
নারীর মর্যাদা ছিল সবচেয়ে করুণ অধ্যায়। কন্যাসন্তানের জন্মসংবাদ শুনলে পিতার মুখ কালো হয়ে যেত লজ্জায়, আর সমাজের কলঙ্কের ভয়ে অসংখ্য পিতা নিজ হাতে জীবন্ত বালিকাকে মাটিচাপা দিতেন, যার হৃদয়বিদারক বর্ণনা পরবর্তীতে কোরআনেও উঠে এসেছে।
দাসত্বের নিষ্ঠুর শৃঙ্খলে বন্দি ছিল অগণিত মানুষ। এতিম ও অসহায়দের সম্পদ কেড়ে নেওয়া ছিল দৈনন্দিন ঘটনা।
সুদ আর জুয়ার নেশায় আচ্ছন্ন ছিল গোটা সমাজ। মদ ছিল আভিজাত্যের প্রতীক, রক্তপাত ছিল বীরত্বের মাপকাঠি।
জ্ঞান, বিজ্ঞান কিংবা ন্যায়বিচারের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সেখানে গড়ে ওঠেনি; বরং তরবারির ধারই নির্ধারণ করত ন্যায়-অন্যায়ের সীমারেখা।
ঠিক এমনই এক ঘোর অমানিশার মধ্যরাতে ইতিহাস সাক্ষী রাখল এক অবিস্মরণীয় ভোরের।
আমুল ফিল’ বা হস্তীবাহিনীর বছর নামে পরিচিত সেই সময়ে, রবিউল আউয়াল মাসের এক পবিত্র প্রভাতে মক্কা নগরীতে জন্ম নিলেন সেই মহামানব, যার আগমনের কথা ঘোষিত হয়েছিল পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতেও—হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
জন্মের পূর্বেই হারিয়েছিলেন পিতাকে, শৈশবেই কেড়ে নিয়েছিল নিয়তি মাতৃস্নেহও।
এতিম এই শিশু বেড়ে উঠলেন কঠিন বাস্তবতার কোলে। অথচ তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা আর বিশ্বস্ততার সুবাসে গোটা মক্কা নগরী তাঁকে ডাকত ‘আল-আমিন’ নামে—বিশ্বাসযোগ্য মানুষ। চল্লিশ বছর বয়সে হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় নেমে এলো ওহির প্রথম বাণী, যা এক লহমায় বদলে দিল মানবসভ্যতার গোটা গতিপথ।
ইতিহাস বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করে, যে সমাজ ডুবে ছিল রক্তপাত আর কুসংস্কারের অন্ধকারে, সেই সমাজেই তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ন্যায়বিচার, মানবতা, নারীর মর্যাদা, দাসপ্রথার অবসান আর ভ্রাতৃত্বের এক অভূতপূর্ব সভ্যতা।
মাত্র ২৩ বছরের ব্যবধানে গোত্রে গোত্রে বিভক্ত, রক্তপিপাসু এক জনগোষ্ঠী পরিণত হলো ন্যায়নিষ্ঠ, শিক্ষিত ও সুশৃঙ্খল এক জাতিতে। তাঁদের হাত ধরে পরবর্তীতে গড়ে উঠল বিজ্ঞান, দর্শন আর সভ্যতার এক নতুন স্বর্ণযুগ।
বিশ্বের বহু অমুসলিম ইতিহাসবিদও এই রূপান্তরকে মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম বিস্ময়কর অধ্যায় বলে স্বীকার করেছেন।
এই মহান আগমনের স্মৃতি স্মরণ করেই যুগে যুগে ইসলামী পণ্ডিতদের হৃদয় উদ্বেলিত হয়েছে অপার আনন্দে ও কৃতজ্ঞতায়।
তাদের যুক্তির মূল ভিত্তি কোরআনের সেই ঘোষণা, যেখানে আল্লাহ নবীজি (সা.)-কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে অভিহিত করেছেন।
যে আগমন রহমতস্বরূপ, তাকে স্মরণ করে আনন্দ প্রকাশ করা তাদের চোখে ঈমানেরই স্বাভাবিক বহিঃপ্রকাশ।সূএ : যুগান্তর।