নিজস্ব প্রতিবেদক গাইবান্ধা
প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামিকে নাবালক প্রমাণ করতে জাল জন্মসনদ ও ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে জামিন করানোর অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে আদালতের অর্ডার শিটে কাটাকাটি এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি গায়েব করার অভিযোগও রয়েছে।
এসব ঘটনায় গাইবান্ধা জেলা বারের এক আইনজীবী, গোবিন্দগঞ্জ কোর্টের জিআরও এবং এক মুহুরির বিরুদ্ধে থানায় মামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
বুধবার ০২ সেপ্টেম্বর গাইবান্ধা নারী ও শিশু আদালত-২-এর বিচারক ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ এ আদেশ দেন।
চার আসামিকে গ্রেপ্তারের পর শুরু হয় তৎপরতা:
জানা গেছে, গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অনলাইন হ্যাকিংসহ বিভিন্ন মামলায় পলাশ রানা, সুমন মিয়া, শামীম চৌধুরী ও এনামুল হককে গ্রেপ্তার করে।
আসামিদের কারাগার থেকে মুক্ত করতে তাদের স্বজনেরা পরে আইনজীবী শেফাউল ইসলামের পরামর্শ নেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী এনামুল হক নামে এক বিবাহিত যুবককে নাবালক ও শিশু হিসেবে প্রমাণ করার জন্য জাল জন্মসনদ তৈরি করা হয়।
এরপর ওই ভুয়া জন্মসনদ ব্যবহার করে তিনটি মামলায় প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের শিশু হিসেবে দেখিয়ে জামিন নেওয়ার অভিযোগ ওঠে জেলা বারের আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের বিরুদ্ধে।
আদালতের নথি গায়েব ও আদেশ কাটাকাটির অভিযোগ:
শুধু প্রাপ্তবয়স্ক আসামিদের নাবালক দেখিয়ে জামিন করানো নয়, আইনজীবী শেফাউল ইসলামের বিরুদ্ধে আসামিদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কোর্ট জিআরও ও মুহুরি আব্দুস সবুরের সহযোগিতায় তিনি আদালতের নথি গায়েব এবং আদেশ শিটে কাটাকাটি করেন।
ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে সাবালক আসামিদের নাবালক হিসেবে দেখানোর পর তাদের জামিনও গ্রহণ করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগের পর তদন্তের নির্দেশ:
পরে আইনজীবী সারোয়ার হোসেন, মোত্তালিব হোসেনসহ কয়েকজন আইনজীবী জামিনে থাকা চার আসামির জামিন বাতিলের জন্য আদালতে আবেদন জানান।
তারা জামিনের বিরোধিতা করলে আদালত বিষয়টি আমলে নেন এবং তদন্তের নির্দেশ দেন।
নারী ও শিশু আদালত-২, গাইবান্ধার বিচারক এ বিষয়ে তদন্তের দায়িত্ব দেন গোবিন্দগঞ্জ আমলি আদালতের বিচারক ও সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম গালিব হাসানকে।
গত ১৯ আগস্ট তিনি নারী ও শিশু আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। তদন্তে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
আইনজীবীর সনদ বাতিলের সুপারিশ:
সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এসএম গালিব হাসান তাঁর তদন্ত প্রতিবেদনে বিভিন্ন সুপারিশ করেন।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় মূল অভিযুক্ত আইনজীবী শেফাউল ইসলাম রিপনের সনদ বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে তাঁর মুহুরি হাসান আলীর নিবন্ধন বাতিলের কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গোবিন্দগঞ্জ চৌকি আদালতের তৎকালীন জিআরও পুলিশ সদস্য আব্দুস সবুরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
তদন্ত প্রতিবেদনে এ ধরনের ঘটনাকে দেশের সামগ্রিক বিচার বিভাগের জন্য একটি ‘কালো অধ্যায়’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের নির্দেশে থানায় মামলা:
তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর শিশু আদালতের বিচারক মোহাম্মদ ইফতেখার বিন আজিজ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করার নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, গোবিন্দগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারীকে বাদী করে গোবিন্দগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করতে বলা হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত আইনজীবী শেফাউল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়।
তবে তাঁর ফোন বন্ধ থাকায় এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার বিষয়ে জানতে শুক্রবার ০৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মোজাম্মেল হকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, “মামলার আদেশটি এখনও থানায় আসেনি।
আদেশটি পাওয়া মাত্রই আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মামলার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।”