নিজস্ব প্রতিবেদক গাজীপুর
, বক
গাজীপুরে দৈনিক কালবেলার জেলা প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মহিন উদ্দিন রিপনকে অপহরণ, নির্যাতন, এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি এবং জোরপূর্বক আপত্তিকর ভিডিও ধারণের অভিযোগে দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে গাজীপুর।
এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন গণমাধ্যমকর্মীরা।
তাঁদের অভিযোগ, প্রকাশ্য দিবালোকে ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল সাংবাদিক রিপনের ওপর হামলা চালালেও এখন পর্যন্ত মাত্র দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাঁরা।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেল ৪টার দিকে গাজীপুর মহানগরের গাছা থানার বোর্ডবাজার এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে ‘জাতির কণ্ঠ’ পরিবারের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে এসব কথা বলেন সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
মানববন্ধন ঘিরে বিভিন্ন স্লোগান, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা।
মানববন্ধনে বক্তারা পুলিশ কমিশনার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন রেখে বলেন, গত ২৬ অক্টোবর দুপুরে একজন সাংবাদিককে অপহরণ করে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর তিন দিন পেরিয়ে গেলেও সব অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা যায়নি কেন?
প্রশাসন কি বসে বসে মাদক কারবারি ও সন্ত্রাসীদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে? একজন গণমাধ্যমকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়—এমন প্রশ্নও তোলেন তাঁরা।
বক্তারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অবিলম্বে এ ঘটনায় জড়িত সব অভিযুক্তকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করতে হবে।
অন্যথায় গাজীপুর থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রয়োজনে পুরো গাজীপুর অচল করে দেওয়ার মতো কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজবিরোধী নাগরিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ও চ্যানেল এস-এর গাজীপুর প্রতিনিধি মো. মোছাদ্দিকুর রহমান হাজী মুসা।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দৈনিক গণকণ্ঠের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার শেখ জিসান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ‘জাতির কণ্ঠ’-এর প্রকাশক তানজিল মাহমুদ হিমেল ও সম্পাদক মো. মাজহারুল ইসলাম রুবেল।
প্রকাশক তানজিল মাহমুদ হিমেলের সার্বিক তত্ত্বাবধানে মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়।
এ সময় বক্তব্য দেন গাছা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. আশরাফুল, দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিনিধি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মো. নাসির উদ্দিন, মাদক-সন্ত্রাস-চাঁদাবাজবিরোধী নাগরিক আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গাজীপুর জেলা প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. ইসমাঈল হোসেন,
গাজীপুর মহানগর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. শহীদ, দৈনিক প্রতিদিনের কাগজের প্রতিনিধি মো. টুটুল, মানবাধিকারকর্মী আবুল কাশেম, দৈনিক নববাণীর গাজীপুর প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলম মাসুদ, আজকের বসুন্ধরার প্রতিনিধি মো. অভি, ময়না আক্তারসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
বক্তারা বলেন, সাংবাদিকদের কাজ হলো মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও অপরাধের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করে জনস্বার্থ রক্ষা করা।
অথচ সেই পেশাগত দায়িত্ব পালনের কারণে একজন সাংবাদিককে অপহরণ, নির্যাতন, চাঁদা দাবির মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ধরনের ঘটনা স্বাধীন সাংবাদিকতা, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও আইনের শাসনের জন্য গুরুতর হুমকি।
তাঁরা আরও বলেন, সাংবাদিক রিপনের ওপর হামলার ঘটনায় শুধু দুজনকে গ্রেপ্তার করেই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না।
ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
হামলার পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বা মাদক কারবারিদের সংশ্লিষ্টতা থাকলে তা-ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করে আনতে হবে।
সাংবাদিকদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বক্তারা অভিযোগ করেন, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ব্যর্থতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলতে পারে।
তাঁরা পুলিশ কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান, ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে তাঁরা দ্রুত তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ ও দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান।
মানববন্ধনে আরও বলা হয়, সাংবাদিক রিপনের ওপর হামলার ঘটনায় বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠন নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে।
দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচিও শুরু হয়েছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার করা না হলে এই প্রতিবাদ আরও বিস্তৃত হবে বলে তাঁরা সতর্ক করেন।
সাংবাদিক রিপনের অভিযোগ, গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) দুপুর ২টার দিকে গাজীপুর মহানগরের টঙ্গী বাজার এলাকার সেনাকল্যাণ শপিং কমপ্লেক্স-সংলগ্ন হোন্ডা রোডের সামনে থেকে তাঁকে অপহরণ করা হয়।
তিনি দৈনিক কালবেলার গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি হিসেবে পেশাগত সংবাদ সংগ্রহের কাজে সেখানে গিয়েছিলেন।
রিপনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে শাহ সিমেন্টের জেনারেল ম্যানেজার আসিফ মাহমুদের সঙ্গে কথা বলার পর তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দিকে রওনা হওয়ার সময় একদল দুর্বৃত্ত তাঁদের ঘিরে ধরে।
পরে তাঁকে মোটরসাইকেলসহ জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর হাত, চোখ ও মুখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সাংবাদিক রিপনের অভিযোগ, অপহরণের পর তাঁকে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
দেশীয় অস্ত্র দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারধর করা হয়। পাশাপাশি মাদকবিরোধী সংবাদ প্রকাশ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার বন্ধ করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, অজ্ঞাত স্থানে এক নারীর সঙ্গে তাঁকে জোরপূর্বক আপত্তিকর অবস্থায় রেখে ভিডিও ধারণ করা হয়।
পরে ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টঙ্গীর হাজীর মাজার বস্তি এলাকার মাদক ব্যবসা, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ এবং ফেসবুক লাইভ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়।
এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ অব্যাহত রাখলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
রিপনের দাবি, এ সময় তাঁর কাছে থাকা দুই লাখ টাকা, মোটরসাইকেলের হেলমেট ও দৈনিক কালবেলার পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা নির্যাতনের একপর্যায়ে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাঁকে রাস্তায় ফেলে রেখে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
পরে স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে টঙ্গী শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা নেন তিনি।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে শাহ সিমেন্টের জেনারেল ম্যানেজার আসিফ মাহমুদ জানান, তিনি সাংবাদিক রিপনের সঙ্গে অবস্থান করার সময় একদল অপরিচিত ব্যক্তি জোরপূর্বক তাঁকে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে রিপনের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে কাউকে কিছু না বলার জন্য দুর্বৃত্তরা তাঁকেও হুমকি দিয়েছে বলে জানান তিনি।গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (অপরাধ বিভাগ-উত্তর) শফিকুল ইসলাম হাসপাতালে সাংবাদিক রিপনের শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে যান।
এ সময় তিনি একজন গণমাধ্যমকর্মীর ওপর এমন হামলার নিন্দা জানান এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে বলে জানান। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে আগে জানানো হয়েছে।
তবে বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার, ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য এবং আপত্তিকর ভিডিও ধারণের অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মানববন্ধন থেকে সাংবাদিক রিপনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঘটনার সঙ্গে জড়িত সব অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা শেষ পর্যন্ত হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, অপহরণ ও নির্যাতনের ঘটনায় বিচারহীনতা মেনে নেওয়া হবে না।
দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে গাজীপুরসহ সারা দেশে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।