আ জা ডেক্স
বাবা দিবসে তপনের লিখাটা পড়ে একটু আবেগপ্রবন হয়ে গিয়েছিলাম। তপন খুব সুন্দর করে প্রতিটা ঘটনার যেভাবে বর্ণনা দিয়েছে, তা আমার হ্রদয়-অন্তর ছুঁয়ে গেছে।
এরপর "বাবা" নিয়ে লিজা, সোয়েব এবং ময়নার আবেগঘন লেখাগুলো পড়ে, কলোনীতে ফেলে আসা বাবার সাথে স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেলো।
আমার আম্মা যখন মারা যায়, তখন আমি বেশ ছোট, মাত্র পাওয়ার স্টেশন হাইস্কুলে ক্লাশ সিক্সে ভর্তি হয়েছি। আমাদের আশ্রয় হলো নানাবাড়িতে।
মারা যাবার দুই বছর পর, বাবা নানুবাড়ি থেকে আমাকে কলোনীর বাসায় নিয়ে আসলেন। স্বাভাবিক ভাবে আমার নতুন মা, তার সংসারে আমাকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেননি। আমার বাবা সব বুঝতেন।
বেশীরভাগ সময়ে, আমাদের নতুন মা স্কুলে যাওয়ার সময়, টাকাপয়সা দিতে চাইতেন না। টিফিনের টাকা না থাকার কারনে, টিফিন পিরিয়ডে না খেয়ে, ক্লাশ রুমেই একা একা বহুদিন বসে থেকেছি।
স্কুল ছুটির পর বিকেল ৫টার দিকে বাসায় ফিরে দেখতাম, আমার জন্য খাবার রাখা থাকত না। না খেয়েই বিকেলে কলোনীর মাঠে খেলতে চলে যেতাম। কাউকে বুঝতে দিতাম না।
রাতে আব্বা ফিরলে, তিনি আমাদেরকে ডেকে নিয়ে, একসাথে রাতের খাবার খেতেন। তখন তার সাথে বসে পেট পুরে খেতাম।
আব্বা বিষয়টা বুঝতে পেরে, আমাকে গোপনে ডেকে নিয়ে বলল, কাশেমের দোকানে অগ্রীম টাকা রাখা আছে এবং বলে দিয়েছি, তোদের যখন যা খেতে ইচ্ছে করবে নিয়ে নিবি, টাকা লাগলেও চেয়ে নিবি।
তারপর থেকে নতুন আম্মার কাছে আর টাকা পয়সা চাইতাম না। রোজ কাশেম ভাই থেকে স্কুলে যাওয়ার সময় ১ টাকা নিতাম, আর টিফিন পিরিয়ডে সেই টাকা দিয়ে দুটো সিংগারা কিনে খেতাম।
স্কুল থেকে বাসায় ফিরে, কাশেম ভাইয়ের দোকান থেকে অর্ধেক পাউরুটি আর দুটি কলা নিয়ে, নদীর পাড়ে কাশবনের ভিতর বসে বসে খেতাম, আর লুকিয়ে চোখের পানি ফেলতাম।
😢 তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে মার সাথে একা একা কথা বলতাম, আর তার সাথে অভিমান করতাম।
😟 ভাবতাম, আম্মা বেঁচে থাকলেতো আমাদের এইদিন দেখতে হতো না। কলোনিতে হাসিমুখে সবার সাথে মিশতাম, খেলতাম, গল্প করতাম কিন্ত কাউকে বুঝতে দিতাম না, আমার ভিতরের ছাই-চাঁপা দেয়া অব্যক্ত কষ্টগুলোকে।
এভাবে দিন যেতে লাগল, সময়ের সাথে সাথে আমার ভেতর একটা পরিবর্তন আসল। অনার্স (একাউন্টিং) 3rd year এ উঠে, কেন যেন আমার মনে হল, কলোনীতে থাকলে আমার পড়ালেখা হবেনা এবং ভাল রেজাল্টও করতে পারবনা।
আব্বাকে কলোনীর বাসা ছাড়ার কথা বললাম। আব্বা আমার কথায় রাজী হয়ে, কলোনীর বাসা ছেড়ে দিল। আমি আব্বার সম্মান রাখলাম, আল্লাহর কৃপায় অনার্স ফাইনালে ভাল রেজাল্ট করলাম।
আমার বাবা অনেক খুশী হয়েছিল সেদিন। বায়তুল মোকাররম মার্কেটে আমাকে নিয়ে গিয়ে রেডিমেড একটা স্যুট কিনে দিয়েছিল।
বাবারাতো এমনি হয়। MBA ফাইনাল পরীক্ষার সময় আমি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাই। আমি তখন ঢাকায় বন্ধুদের সাথে মেসে থাকতাম।
বন্ধুরা বাড়ীতে খবর পাঠালো। আব্বা আমাকে দেখতে মেসে এসেছিলেন। তারপর, প্রতিদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় একবার দেখে যেতেন, আর অফিস শেষ করে আরেকবার দেখে যেতেন।
আমার মাথায় হাত দিয়ে দোয়া পড়ে বলল, তুই যতটুকু পারিছ পরীক্ষায় attend কর। আল্লাহই তোর সহায় হবে। আমি অসুস্থতার মধ্যেও পরীক্ষা দেয়া শুরু করলাম।
কিন্ত "Intl. Financial Reporting" সাবজেক্টের পরীক্ষার আগের দিন থেকে আমার জ্বর আরো বেড়ে গেলো। বিছানা থেকে উঠতেই পারছিলাম না, ডিসিশান নিলাম, পরীক্ষা ড্রপ দিবো।
সকালের দিকে আব্বা মেসে এসে হাজির। আমাকে বসিয়ে বসিয়ে কমলা খাওয়াল, আপেল কেটে খাওয়াল, মাথায় জলপট্টি দিল।
বাবারা তে এমনই হয়। আব্বার হাতের স্পর্শে, আমি যেন নতুন প্রান শক্তি ফিরে ফেলাম। বাবা বলল, আজকে তোর কি পরীক্ষা? সে সাবজেক্টটা একটু revise দে।
আমি তোর সাথে আজ Dhaka University তে যাব, তোকে তোর পরীক্ষা হলে নামাতে। পরীক্ষা শেষে, তোকে মেসে নামিয়ে দিয়ে, আমি চিটাগাং রোড যাব।
আমি বই খুলে শুধু পাতাগুলো উল্টাতে লাগলাম, মনে হল লিখাগুলো চিরচেনা। আমি যতটুকু পেরেছি, সাবজেক্টটি একটু রিভাইস দিলাম।
তারপর MBA ফাইনাল পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার পর দেখি আমি "Intl. Financial Reporting" সাবজেক্টেই সবচেয়ে বেশী CGPA পেয়েছি।
সব মিলিয়ে খুব ভাল একটা রেজাল্ট করলাম। এটাকেই বলে বাবার দোয়া, আল্লাহর রহমত।
আমার জীবনে বাবা ছিলো, গাছের ছায়ার মত। মা-মারা যাবার পর, তিনি আমাদেরকে সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে আগলে রাখতেন।
মাঝে মাঝে মনে হয়, বাবাকে কবর থেকে তুলে নিয়ে আসি। জড়িয়ে ধরে বলি, বাবা আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। ভীষন ভালবাসি। ❤️🧡❤️❤️