ঢাকা, বাংলাদেশ শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ আজকের পত্রিকা ই-পেপার আর্কাইভ কনভার্টার ফটোগ্যালারি
Amaderjagaran || Daily Newspaper In Bangladesh

শিরোনাম:

বৃদ্ধাকে বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে, স্ত্রীসহ আহত প্রতিমন্ত্রী কলকাতা পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’র নাম পরিবর্তন বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স ও রাকাবে নতুন দুই এমডি কুয়েতে বাংলাদেশিদের বিশেষ সতর্ক থাকার আহ্বান দূতাবাসের হরমুজ প্রণালিতে নৌবাহিনী পাঠাতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তুতি তরুণের হাতে আগামী পৃথিবী আত্মশুদ্ধি, জ্ঞান ও সভ্যতার নবযাত্রা বিশ্ব ইজতেমার দুই পর্বের তারিখ নির্ধারণ আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু...দুদক র‍্যাবের নাম বদলের বিল পাস বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তার ২৮ ক্রেডিট কার্ড, ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

তরুণের হাতে আগামী পৃথিবী আত্মশুদ্ধি, জ্ঞান ও সভ্যতার নবযাত্রা

মুফতি নাজমুল ইসলাম ফারুক

প্রকাশ : শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর,২০২৬, ১১:১৯ এ এম
তরুণের হাতে আগামী পৃথিবী  আত্মশুদ্ধি, জ্ঞান ও সভ্যতার নবযাত্রা

​যৌবন কোনো ক্ষণস্থায়ী বয়সের নাম নয়; এটি আলোর অঙ্কুর, সম্ভাবনার বসন্ত, ইতিহাসের বাঁকবদল এবং ভবিষ্যতের নির্মাণশালা।

যখন কোনো জাতি ক্লান্ত হয়, তরুণেরা তাকে জাগায়; যখন কোনো সভ্যতা পথ হারায়, তরুণেরা তাকে নতুন দিগন্ত দেখায়।

নদীর উচ্ছ্বাস, আকাশের ভোর, বৃক্ষের নবপল্লব এবং মরুভূমিতে বৃষ্টির প্রথম ফোঁটার মতোই যৌবন জীবনকে নবীন করে তোলে। ​

ইতিহাসের পৃষ্ঠা খুললে দেখা যায়, পৃথিবীর অধিকাংশ নবজাগরণ তরুণদের হাত ধরেই এসেছে। জ্ঞানচর্চা, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সামাজিক সংস্কার এবং স্বাধীনতার সংগ্রামে তরুণেরা বারবার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।

তাদের স্বপ্ন কখনো গ্রন্থাগারে জন্ম নেয়, কখনো গবেষণাগারে, কখনো মসজিদের মিনারে, কখনো কৃষকের মাঠে, আবার কখনো মানবতার কান্নার পাশে দাঁড়িয়ে।

যে তরুণ নিজের ভেতরে আলো জ্বালাতে পারে, সে সমাজকেও আলোকিত করতে পারে। ​বাংলাদেশ আজ এক বিরাট জনমিতিক সম্ভাবনার দেশ। দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ।

অর্থনীতিবিদেরা একে “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বলে অভিহিত করেন। বিশ্বব্যাংক, ইউএনডিপি এবং আইএলওর বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষ ও শিক্ষিত যুবশক্তি একটি দেশের উৎপাদনশীলতা, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

কিন্তু এই সম্ভাবনা তখনই বাস্তবে রূপ নেয়, যখন শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি হয়, গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ে, প্রযুক্তিগত দক্ষতা উন্নত হয় এবং উদ্যোক্তা সৃষ্টির পরিবেশ গড়ে ওঠে।

​বর্তমান যুগ প্রযুক্তি ও জ্ঞানের যুগ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, বায়োটেকনোলজি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তৃত পরিসরে তরুণেরা নতুন পৃথিবীর স্থপতি হয়ে উঠছে।

কিন্তু প্রযুক্তি নিজে কখনো কল্যাণকর বা অকল্যাণকর নয়; এর ব্যবহারই তার চরিত্র নির্ধারণ করে।

তাই প্রযুক্তির সঙ্গে নৈতিকতার, দক্ষতার সঙ্গে মানবিকতার এবং জ্ঞানের সঙ্গে প্রজ্ঞার সংযোগ অপরিহার্য। ​যুবসমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের সৃজনশীলতা, আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হতে পারে দিকনির্দেশনার অভাব।

বেকারত্ব, মাদকাসক্তি, ডিজিটাল আসক্তি, নৈতিক অবক্ষয়, হতাশা, ভোগবাদ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা আজকের তরুণদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

গবেষণায় দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব আত্মবিশ্বাসকে দুর্বল করে এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ায়। আবার উদ্দেশ্যহীন জীবন তরুণকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দিতে পারে।

তাই যুব উন্নয়নের প্রশ্নটি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক এবং মানসিকও। ​ইসলাম যুবসমাজকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা যুবকদের ঈমান, ধৈর্য, আত্মত্যাগ এবং সত্যনিষ্ঠার বহু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন।

সূরা আল-কাহফে বর্ণিত আশহাবে কাহফ ছিলেন একদল ঈমানদার তরুণ, যারা সত্যের জন্য সমাজের প্রবল বিরোধিতার মধ্যেও অবিচল ছিলেন।

কুরআন তাদের সম্পর্কে বলে যে, আল্লাহ তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করেছিলেন। এই আয়াত আমাদের শেখায়—সত্যের পথে অবিচল তরুণই ইতিহাসের প্রকৃত নির্মাতা।

​মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে তরুণদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হযরত আলী (রা.) কৈশোরেই ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) তাঁর যৌবনের বিলাসিতা ত্যাগ করে ইসলামের দাওয়াতের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন।

হযরত উসামা ইবনে যায়েদ (রা.) অল্প বয়সে একটি বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব দেন।

এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, ইসলামে নেতৃত্বের যোগ্যতা বয়সে নয়; চরিত্র, জ্ঞান, তাকওয়া এবং দায়িত্ববোধে নির্ধারিত হয়।

​একটি সহিহ হাদিসে এসেছে, কিয়ামতের দিন মানুষকে তার যৌবন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে—কীভাবে তা অতিবাহিত করেছে।

এই প্রশ্নের মধ্যেই যৌবনের মূল্য নিহিত রয়েছে। যৌবন আল্লাহর এক মহান আমানত। যে তরুণ তার যৌবনকে ইবাদত, জ্ঞানার্জন, মানবসেবা এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যয় করে, সে কেবল নিজের জীবন নয়, সমাজের ভবিষ্যৎও আলোকিত করে।

​আজকের তরুণদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আত্মশুদ্ধি। জ্ঞান অর্জন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু চরিত্রহীন জ্ঞান বিপজ্জনক। প্রযুক্তি প্রয়োজন, কিন্তু নৈতিকতাহীন প্রযুক্তি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন জরুরি, কিন্তু মানবিকতা ছাড়া উন্নয়ন শুষ্ক মরুভূমির মতো।

তাই ইসলামের শিক্ষা হলো—ইলমের সঙ্গে আমল, শক্তির সঙ্গে তাকওয়া, নেতৃত্বের সঙ্গে জবাবদিহি এবং স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। ​বাংলা সাহিত্যও যৌবনের এই নৈতিক শক্তিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করেছে।

কাজী নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ এবং জীবনানন্দ দাশের স্বপ্নময় দিগন্ত তরুণ হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। সাহিত্য আমাদের শেখায়, যে হৃদয় অন্যের কান্না শুনতে পায় না, সে হৃদয় কখনো মহৎ হতে পারে না।

আর ইসলাম শেখায়, যে হৃদয়ে আল্লাহভীতি নেই, সে হৃদয়ে প্রকৃত শান্তিও নেই। এই দুই ধারার মিলনেই গড়ে ওঠে জ্ঞান, সৌন্দর্য এবং নৈতিকতার সমন্বিত মানবিক সমাজ। ​

লেখাটি আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—আমরা কি তরুণদের কেবল পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ রাখছি, নাকি তাদের গবেষণা, উদ্ভাবন, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং আধ্যাত্মিক বিকাশের পথও উন্মুক্ত করছি?

পরিবার যদি ভালোবাসার বিদ্যালয় হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি চিন্তার মুক্তাঙ্গন হয়, মসজিদ যদি আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র হয় এবং রাষ্ট্র যদি ন্যায় ও সুযোগের পরিবেশ নিশ্চিত করে, তবে একটি প্রজন্ম ইতিহাস পরিবর্তন করতে সক্ষম। ​

পরিশেষে বলা যায়, তরুণেরা কেবল আগামী দিনের নাগরিক নয়; তারা আজকের পৃথিবীরও দায়িত্বশীল নির্মাতা।

তাদের হাতে রয়েছে জ্ঞানের প্রদীপ, প্রযুক্তির শক্তি, মানবতার আহ্বান এবং ঈমানের আলো।

যৌবনের প্রকৃত সৌন্দর্য ক্ষমতায় নয়, চরিত্রে; জনপ্রিয়তায় নয়, নৈতিকতায়; সম্পদে নয়, মানবসেবায়; আর ক্ষণস্থায়ী সাফল্যে নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে।

আসুন, আমরা এমন এক তরুণ প্রজন্ম গড়ে তোলার অঙ্গীকার করি, যারা কুরআনের আলোয় আলোকিত, সুন্নাহর আদর্শে অনুপ্রাণিত, জ্ঞানে সমৃদ্ধ, গবেষণায় অগ্রগামী, প্রযুক্তিতে দক্ষ, চরিত্রে নির্মল এবং মানবতার সেবায় নিবেদিত।

কারণ ঈমান, জ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তরুণই একটি জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ এবং একটি আলোকিত সভ্যতার সবচেয়ে উজ্জ্বল সূর্যোদয়।

​লেখক: প্রাবন্ধিক ও ইসলামি গবেষক,সহ-সুপার, আল ফালাহ দাখিল মাদ্রাসা, সোনাইমুড়ী, নোয়াখালী। ইমেইল: nazmulislam19122@gmail.com। সূএ : বাংলাদেশের খবর। 

সম্পর্কিত

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)