আ জা আন্তর্জাতিক ডেক্স
ভারতীয় নৌবাহিনীতে দ্রুত গতিতে নতুন যুদ্ধজাহাজ যুক্ত হচ্ছে। একই সময়ে চীনও তার বিশাল নৌবহর আধুনিক করছে এবং দূর সমুদ্রে উপস্থিতি বাড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তান চীনের কাছ থেকে নতুন সাবমেরিন সংগ্রহের পাশাপাশি নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তিন দেশের এসব পদক্ষেপ ভারত মহাসাগর, আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নতুন সামরিক ও কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করছে।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী এক দশকের মধ্যে নৌবহরের আকার ২০০টির বেশি জাহাজে উন্নীত করতে চায় ভারত।
দেশটির বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে একই সঙ্গে ফ্রিগেট, ডেস্ট্রয়ার, সাবমেরিন বিরোধী যুদ্ধজাহাজ, টহল জাহাজ এবং সহায়ক নৌযান নির্মাণ চলছে।
গড়ে কয়েক সপ্তাহ পরপর নতুন কোনো যুদ্ধজাহাজ ভারতীয় নৌবাহিনীতে যুক্ত হচ্ছে। তবে ভারতের এই তৎপরতা একেবারে হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়।
বহু বছর ধরে চলা নৌবাহিনী আধুনিকায়ন পরিকল্পনা এখন দৃশ্যমান গতি পেয়েছে।
পুরোনো জাহাজ অবসরে যাওয়ায় সৃষ্ট ঘাটতি পূরণ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ বলে জানিয়েছে ভারত সরকার।
ভারতের প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বিভিন্ন শিপইয়ার্ডে কয়েক ডজন বড় নৌযান নির্মাণাধীন রয়েছে।
এসব প্রকল্পে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি শিপইয়ার্ডের পাশাপাশি বহু ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানও কাজ করছে।
সরকার এই কর্মসূচিকে শুধু সামরিক প্রস্তুতি নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়নের বড় প্রকল্প হিসেবেও তুলে ধরছে।
ভারতের নতুন প্রজন্মের যুদ্ধজাহাজে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সরঞ্জামের ব্যবহার বাড়ানো হয়েছে।
তবে ইঞ্জিন, অস্ত্রব্যবস্থা, সেন্সর এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির জন্য দেশটি এখনো বিদেশি সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
ফলে নৌবাহিনীর সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা অর্জনও নয়াদিল্লির অন্যতম লক্ষ্য।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের নৌ সক্ষমতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ চীনের দ্রুত সম্প্রসারিত নৌবাহিনী।
গত কয়েক দশকে চীন বিপুলসংখ্যক ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট, সাবমেরিন, বিমানবাহী রণতরি ও উভচর যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ করেছে।
জাহাজের সংখ্যার বিচারে চীনের নৌবাহিনী বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম বলে বিবেচিত। চীনা নৌবাহিনী এখন শুধু নিজস্ব উপকূল বা দক্ষিণ চীন সাগরেই সীমাবদ্ধ নয়।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, এডেন উপসাগর এবং পূর্ব আফ্রিকার উপকূলেও নিয়মিত উপস্থিতি বাড়িয়েছে তারা।
বেইজিংয়ের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জলদস্যুতা মোকাবিলা, মানবিক সহায়তা এবং বিদেশে চীনের নাগরিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষাই এসব কার্যক্রমের উদ্দেশ্য।
২০০৮ সাল থেকে এডেন উপসাগর ও সোমালিয়া উপকূলে বাণিজ্যিক জাহাজকে নিরাপত্তা দিয়ে আসছে চীনা নৌবাহিনী।
বিভিন্ন সময়ে দেশটির যুদ্ধজাহাজ ও রসদবাহী জাহাজ ভারত মহাসাগরের বিভিন্ন বন্দরে যাত্রাবিরতিও করেছে।
বেইজিং এসব সফরকে স্বাভাবিক নৌ কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে।
তবে ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ চীনের এই উপস্থিতিকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষ করে পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং পূর্ব আফ্রিকার বিভিন্ন বন্দরে চীনের বিনিয়োগ নিয়ে নয়াদিল্লির উদ্বেগ রয়েছে।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমানে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত কিছু বন্দর ভবিষ্যতে চীনা নৌবাহিনীর রসদ বা সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
তবে চীনের প্রতিটি বন্দর বিনিয়োগ, গবেষণা জাহাজ বা নৌ সফরকে সরাসরি সামরিক হুমকি হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই।
এসব প্রকল্পের বড় অংশের সঙ্গে বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ জড়িত। একই সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান নৌ সক্ষমতার কৌশলগত প্রভাবও পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না।
এই সমীকরণে পাকিস্তানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। দেশটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন ফ্রিগেট সংগ্রহ করেছে এবং চীনের সহায়তায় আটটি হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন নৌবহরে যুক্ত করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের জন্য নির্মিত প্রথম হাঙ্গর শ্রেণির সাবমেরিন আনুষ্ঠানিকভাবে চীনে দেশটির নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, কয়েকটি সাবমেরিন চীনে তৈরি হবে এবং বাকিগুলো পাকিস্তানে নির্মাণ বা সংযোজন করা হবে।
পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দাবি, এর মাধ্যমে দেশটির সাবমেরিন পরিচালনা, জাহাজ নির্মাণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বাড়বে।
আরব সাগরের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি পরিবহন এবং করাচি ও গওদর বন্দরের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে পাকিস্তান বলছে, নতুন জাহাজ ও সাবমেরিন সংগ্রহ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয়; বরং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলা এবং নিজস্ব সমুদ্রসীমা রক্ষার জন্য প্রয়োজন।
ভারতের দৃষ্টিতে পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন উদ্বেগের কারণ। আধুনিক সাবমেরিন দীর্ঘ সময় পানির নিচে অবস্থান করে গোপনে টহল চালাতে সক্ষম।
ফলে আরব সাগরে পাকিস্তানের উপস্থিতি আগের তুলনায় আরও কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছেন ভারতীয় বিশ্লেষকেরা।
চীন ও পাকিস্তানের নৌ সহযোগিতা শুধু জাহাজ বা সাবমেরিন কেনাবেচায় সীমাবদ্ধ নয়।
দুই দেশ নিয়মিত যৌথ নৌমহড়া, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের আয়োজিত বহুজাতিক ‘আমান’ নৌমহড়ায় চীনসহ বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী অংশ নেয়।
এসব মহড়ায় জলদস্যুতা মোকাবিলা, সমুদ্রে উদ্ধার অভিযান এবং যৌথ সমন্বয়ের অনুশীলন করা হয়।
অন্যদিকে, ভারতও যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নৌমহড়া ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করেছে।
ফলে ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতিকে শুধু ভারত বনাম চীন-পাকিস্তানের প্রতিযোগিতা হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র উঠে আসে না।
এখানে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি জলদস্যুতা দমন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তায় সহযোগিতাও অব্যাহত রয়েছে।
ভারত বলছে, চীনের বিশাল নৌবহর এবং পাকিস্তানের নতুন সাবমেরিন তার নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। চীন বলছে, নৌবাহিনীর সম্প্রসারণ জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ রক্ষার জন্য প্রয়োজন।
পাকিস্তানও নিজেদের নৌ আধুনিকায়নকে নিরাপত্তা ও প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে।
বাস্তবে তিন দেশের পদক্ষেপই একে অপরকে প্রভাবিত করছে। একটি দেশ নতুন যুদ্ধজাহাজ, সাবমেরিন বা নৌঘাঁটি নির্মাণ করলে অন্য দেশ সেটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে নিজের সক্ষমতা বাড়াতে শুরু করে।
ফলে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপও প্রতিপক্ষের কাছে আক্রমণাত্মক প্রস্তুতি বলে মনে হতে পারে। তবে শুধু জাহাজের সংখ্যা দিয়ে কোনো নৌবাহিনীর শক্তি বিচার করা যায় না।
একটি নৌবাহিনীর কার্যকারিতা নির্ভর করে জাহাজের প্রযুক্তি, অস্ত্রব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, নজরদারি, রক্ষণাবেক্ষণ, বিমান সহায়তা, রসদ সরবরাহ এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার ওপর।
চীনের নৌবহর সংখ্যায় বড় হলেও দেশটিকে দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগর, তাইওয়ান প্রণালি, পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং ভারত মহাসাগরসহ বিস্তৃত এলাকায় নজরদারি করতে হয়।
অন্যদিকে, ভারত ভৌগোলিকভাবে ভারত মহাসাগরের কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকায় এবং আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের কাছাকাছি কৌশলগত সুবিধা ভোগ করে।
পাকিস্তানের নৌবাহিনী তুলনামূলক ছোট হলেও তাদের কার্যক্রম মূলত আরব সাগর ও নিজস্ব উপকূলীয় অঞ্চলকেন্দ্রিক। ভারত, চীন ও পাকিস্তানের এই নৌ প্রতিযোগিতার প্রভাব ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরেও পড়তে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত কোনো দেশের কর্মকাণ্ডকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি সামরিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার মতো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বঙ্গোপসাগরে বড় শক্তিগুলোর যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি, নৌমহড়া, বন্দর বিনিয়োগ, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক সম্পদ ঘিরে প্রতিযোগিতা।
ঢাকা ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রেখেছে। পাকিস্তানসহ অন্যান্য আঞ্চলিক দেশের সঙ্গেও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।
তাই ভারত মহাসাগরে প্রতিযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের জন্য কোনো একটি পক্ষের অবস্থান নেওয়ার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থ, সমুদ্র নিরাপত্তা এবং কৌশলগত ভারসাম্য বজায় রাখাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ভারতে যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের বর্তমান গতি শুধু চীন বা পাকিস্তানকে ঘিরে একতরফা সামরিক প্রস্তুতি নয়।
বরং ভারত, চীন ও পাকিস্তান—তিন দেশই নিজেদের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখতে নৌ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।
ফলে ভারত মহাসাগরে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা—দুই ধারাই একসঙ্গে এগিয়ে চলেছে। সূত্র: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, রয়টার্স।