নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম শহরজুড়ে মশকনিধনে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ আর পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে।
কোথাও ফগার মেশিনে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে, কোথাও খুঁজে ধ্বংস করা হচ্ছে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল।
আজ ১৮ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানে ব্যস্ত রয়েছেন ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে।
মেয়র বিতরণ করছেন সচেতনতামূলক লিফলেট, চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালতও।
শুধু সিটি কর্পোরেশন কিংবা জেলা প্রশাসনই নয়; শহরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি, জাতীয়তাবাদী যুবদলসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনও।
তবুও থামছে না ‘মশার শহর’ চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর দৌরাত্ম্য। একদিকে মশা মারার যুদ্ধ, অন্যদিকে হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শরতের থেমে থেমে বৃষ্টিতে পানি জমে থাকা আর মানুষের অসচেতনতার কারণে এডিশের প্রজনন নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
চট্টগ্রামের ডেঙ্গু পরিস্থিতির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরুতে সংক্রমণ তুলনামূলক কম থাকলেও জুলাই থেকে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে।
আগস্টে এসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাফে বেড়ে গেছে। আর সেপ্টেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহেই সেই ঊর্ধ্বগতি আরও স্পষ্ট হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজারের বেশি মানুষ এবং ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
আক্রান্তের বড় অংশই আসছে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে। আগস্টে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২০২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল।
১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৮৮৩ জনে। ১৪ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৯ জন আক্রান্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৯৬২ জন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর একদিনে আরও ৮৬ জন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ মাস শেষ হওয়ার আগেই আগস্টের তুলনায় সংক্রমণের গতি আরও তীব্র হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, ডেঙ্গু প্রতিরোধে চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গত ৩ সেপ্টেম্বর থেকে নগরের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে চসিকের বিশেষ মশকনিধন ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে।
বিভিন্ন ওয়ার্ডে মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংসের পাশাপাশি পরিচালনা করা হচ্ছে ভ্রাম্যমাণ আদালতও।
গত ১২ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী তিন মাসের ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান-২০২৬’ এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামেও শুরু হয়েছে বিশেষ কর্মসূচি।
ওই দিন চসিক ও জেলা প্রশাসন যৌথভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায়।
মেয়র নিজে ঝাড়ু হাতে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে অংশ নেন এবং ফগার মেশিনে মশকনিধনের ওষুধ ছিটানো হয়।
শুধু নগর নয়, জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদ প্রাঙ্গণে একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করে জেলা প্রশাসন, এ কাজে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।
নানামুখী এমন উদ্যোগের মধ্যেও হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল, আগ্রাবাদ মা শিশু ও জেনারেল হাসপাতালসহ বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।
সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ৭৮-এ পৌঁছেছিল।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা ছিল গুরুতর এবং অনেক রোগী রক্তক্ষরণজনিত লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন।
এর কয়েক দিন পরই আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়তে থাকে। ১০ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেডিকেটেড ডেঙ্গু ইউনিটের ৪০টি শয্যার বিপরীতে ৭১ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকার কথা জানানো হয়।
অতিরিক্ত রোগীদের কেউ কেউ ওয়ার্ডের মেঝেতেও চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।
শহরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় এরই মধ্যে চসিক জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু ম্যানেজমেন্ট সেল চালু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনের পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা।
সেই জায়গাটিই এখন চট্টগ্রামের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এডিসের প্রজননস্থল যতক্ষণ থাকবে, ততক্ষণ মশা নিধনের অভিযান শেষ হওয়ার পর আবারও নতুন মশা তৈরি হবে।
ফলে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হবে, ফগিং হবে, পরিচ্ছন্নতা অভিযান হবে কিন্তু সংক্রমণের মূল চক্র পুরোপুরি ভাঙবে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন আজ বাসসকে বলেন, ‘আমরা নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত মশকনিধকে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছি।
আমি নিজে বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে সচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করছি, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আমরা ডেঙ্গুতে আর কোনো মৃত্যু দেখতে চাই না।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নগরবাসীকেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা গেলে ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তাই বাড়ি ও আশপাশে কোথাও পানি জমতে দেওয়া যাবে না; নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
পরিবেশ পরিষ্কার রাখা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। পরিচ্ছন্নতাকে অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।’
চট্টগ্রামে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন স্থানে জমে থাকছে। আর এসব জমে থাকা পানিই এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করছে বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান।
তিনি আজ বাসসকে বলেন, আক্রান্তের হার বাড়ার পেছনে থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বংশবিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে সেপ্টেম্বরের শেষ বা অক্টোবর পর্যন্ত সংক্রমণের প্রবণতা থাকার আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত, চলতি বছর এখন পর্যন্ত মারা যাওয়া ১৪ জনের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ সব বয়সী রয়েছেন।
গত ১৩ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ১২ জনের মধ্যে সাতজন নারী, তিনজন পুরুষ ও দুইজন শিশু ছিলেন।
এরপর আরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে ২৬ বছর বয়সী এক গর্ভবতী নারী চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে মারা যান।
তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর। অবস্থার অবনতি হলে তাকে চমেক হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এরপর পাহাড়তলী এলাকার চার বছর বয়সী তাসমিন নামে এক শিশুর মৃত্যুর খবরও পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু সিনড্রোমে তার মৃত্যু হয়।