আ জা আন্তর্জাতিক ডেক্স
শেষ বাঁশি বাজতেই টরন্টোর মাঠে যেন দুটি ভিন্ন পৃথিবীর জন্ম হলো।
এক পাশে পর্তুগিজ ফুটবলারদের উচ্ছ্বাস, আর অন্য পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকা লুকা মদ্রিচ।
স্কোরবোর্ড বলছে, পর্তুগাল ২, ক্রোয়েশিয়া ১।
কিন্তু সেই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় গল্পটি ছিল সংখ্যার নয়। সেটি ছিল একটি যুগের অবসানের গল্প। কয়েক সেকেন্ড পরই এগিয়ে এলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।
বহু বছরের সতীর্থ, বহু লড়াইয়ের প্রতিদ্বন্দ্বী আর প্রিয় বন্ধু মদ্রিচকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, মাথায় হাত রেখে কিছুক্ষণ সান্ত্বনা দিলেন।
সেই আলিঙ্গনেই যেন ফুটবল বিদায় জানাল তার গৌরবময় ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক কাণ্ডারিকে।
এই পরাজয়ের মধ্য দিয়েই আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেষ হয়ে গেল লুকা মদ্রিচের অধ্যায়। ম্যাচ শেষে ৪০ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার জাতীয় দলের জার্সিকে বিদায় জানান।
২০১ ম্যাচে ২৯ গোল করা মদ্রিচের ক্যারিয়ারকে শুধু সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না।
প্রায় দুই দশক ধরে তিনি ছিলেন ক্রোয়েশিয়ার হৃদস্পন্দন, এমন একজন নেতা, যিনি ছোট্ট একটি দেশকে বারবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় মঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন।
ম্যাচটিও যেন এমন একজন কিংবদন্তিকে বিদায় জানানোর জন্যই সব নাটকীয়তা জমিয়ে রেখেছিল।
প্রথমার্ধে হয়নি কোনও গোল। পর্তুগাল সুযোগ তৈরি করেছে বারবার, কিন্তু দুর্ভেদ্য দেয়াল হয়ে থাকা ক্রোয়েট গোলকীপার ডমিনিক লিভাকোভিচ বারবার হতাশ করেছেন রোনালদোদের।
অন্যদিকে মাঝমাঠে নিজের চিরচেনা ছন্দে খেলেছেন মদ্রিচ। বয়স চল্লিশ ছুঁলেও তার পায়ের ছোঁয়ায় বল যেন এখনও আগের মতোই কথা বলে।
দ্বিতীয়ার্ধে বদলে যায় দৃশ্যপট। ৫৩তম মিনিটে যোসিপ স্তানিশিচের বাড়ানো বল থেকে ইভান পেরিসিচ গোল করে এগিয়ে দেন ক্রোয়েশিয়াকে। তখন মনে হচ্ছিল, হয়তো আরেকবার অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প লিখবেন মদ্রিচ।
কিন্তু ফুটবল কখনও শেষ বাঁশির আগে কোনো গল্পের সমাপ্তি টানে না। পর্তুগাল ফিরেও এসেছে ঠিক সেভাবেই। প্রথমে অফসাইডের কারণে রোনালদোর গোল বাতিল হয়। কিছুক্ষণ পর ভিএআরের সহায়তায় পাওয়া পেনাল্টি থেকে সমতা ফেরান পর্তুগাল অধিনায়ক।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সেটিই ছিল তার প্রথম গোল। এরপর ম্যাচ যত শেষের দিকে গড়িয়েছে, তত বেড়েছে উত্তেজনা।
অতিরিক্ত সময়ের অপেক্ষায় থাকা লড়াইয়ে যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে রাফায়েল লেয়াওয়ের নিখুঁত ক্রস থেকে গনসালো রামোসের হেডে এগিয়ে যায় পর্তুগাল।
তবুও শেষ হয়নি নাটক। শেষ মুহূর্তে ক্রোয়েশিয়া সমতাসূচক গোল করে উল্লাসে ভেসে যায়।
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিল, হয়তো মদ্রিচের গল্পে এখনও শেষ অধ্যায় লেখা হয়নি। কিন্তু ভিএআর সেই আনন্দ কেড়ে নেয়।
অফসাইডের সিদ্ধান্তে গোল বাতিল হয়, আর সেই সঙ্গে শেষ হয়ে যায় ক্রোয়েশিয়ার বিশ্বকাপ স্বপ্নও। এই ম্যাচটি ছিল আরেকটি ইতিহাসের সাক্ষী।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪০ বা তার বেশি বয়সী দুই আউটফিল্ড ফুটবলার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও লুকা মদ্রিচ, শুরুর একাদশে থেকে একে অপরের বিপক্ষে খেললেন। একজনের পথ এগিয়ে গেল, অন্যজন থামলেন।
কিন্তু দুজনই রেখে গেলেন এমন এক উত্তরাধিকার, যা পরিসংখ্যানের গণ্ডি পেরিয়ে ফুটবল সংস্কৃতির অংশ হয়ে থাকবে। ম্যাচ শেষে রোনালদোর কণ্ঠেও ছিল সেই শ্রদ্ধা।
একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমি লুকার সঙ্গে অনেক বছর খেলেছি। ও ফুটবল ইতিহাসের একজন কিংবদন্তি, এখনও।
আমি ওকে বহুবার এই কথা বলেছি। সবকিছুর জন্য তোমাকে অভিনন্দন। তোমার ক্যারিয়ারের আগামী বছরগুলোর জন্য আমার অনেক অনেক শুভকামনা রইল।’
মদ্রিচের গল্প আসলে শুরু হয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত এক শৈশব থেকে। সেই ছেলেটিই পরে ক্রোয়েশিয়াকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন, জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার, একই বছরে ব্যালন ডি’অর জিতে ভেঙেছেন লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য।
২০২২ বিশ্বকাপেও দলকে তুলেছেন সেমিফাইনালে। ক্লাব ফুটবলে টটেনহ্যাম হটস্পার থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, সবখানেই তিনি জিতেছেন শিরোপা, অর্জন করেছেন অগণিত সম্মান।
কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে থাকবে, তিনি এমন এক অধিনায়ক ছিলেন, যিনি ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বের চোখে নতুন মর্যাদা এনে দিয়েছিলেন।
টরন্টোর সেই রাত তাই শুধু একটি নকআউট ম্যাচের স্মৃতি নয়। সেটি এমন এক রাত, যখন স্কোরবোর্ডে লেখা ছিল পর্তুগালের জয়, কিন্তু ফুটবল ইতিহাস আরেকটি পাতায় লিখে রাখল লুকা মদ্রিচ নামের এক শিল্পীর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়।
কিছু বিদায় পরাজয়ের নয়, অর্জনের। কিছু বিদায় চোখে জল আনে, কারণ তারা প্রমাণ করে একজন মানুষ কেবল ট্রফি নয়, নিজের খেলা দিয়েও প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন। লুকা মদ্রিচের বিদায়ও ঠিক তেমনই এক অমলিন অধ্যায়।