নিজস্ব প্রতিবেদক
বিগত সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমান।
বুধবার ০৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রশ্নোত্তর পর্বে সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কিছু অনিয়মের বিষয় নজরে এসেছে। এসব প্রকল্প তদন্তের আওতায় নেওয়া হয়েছে।
এরই মধ্যে কয়েকটি প্রকল্পের তদন্ত মোটামুটি শেষ হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে এলে তার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রকল্পে সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে পদক্ষেপ:
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানোর প্রবণতা বন্ধে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে সাধারণত একটি কারণ দায়ী নয়।
প্রকল্প প্রণয়ন, অনুমোদন, ভূমি অধিগ্রহণ, অর্থায়ন, ক্রয় প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন দুর্বলতা মিলেই এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে নির্ভুল সম্ভাব্যতা সমীক্ষা নিশ্চিত করা এবং অনুমোদনের পর দ্রুত বাস্তবায়ন প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্যোগের কথা জানান তিনি।
পাশাপাশি প্রকল্প প্রণয়ন, প্রক্রিয়াকরণ, অনুমোদন ও সংশোধনের বিদ্যমান নির্দেশিকা সময়োপযোগী করার কাজ চলছে।
চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ড্যাশবোর্ড স্থাপন করা হচ্ছে। নিয়মিত প্রকল্প পর্যালোচনা ও মাঠপর্যায়ে তদারকিও জোরদার করা হয়েছে।
ভূমি অধিগ্রহণ ও ইউটিলিটি স্থানান্তরের কাজ দ্রুত শেষ করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হচ্ছে।
নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়া প্রকল্পগুলোর বিলম্ব, অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি ও সংশোধনের কারণ পর্যালোচনা করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
যেসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৩০ শতাংশের কম, সেগুলোর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা বিবেচনা করে পুনর্বিন্যাস, পরিধি পরিবর্তন কিংবা চলমান রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে সমন্বিত কর্মসূচির আওতায় গুচ্ছ প্রকল্প গ্রহণ এবং সরকারি ক্রয়ে ই-জিপির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি।
২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০ কূপ খননের পরিকল্পনা:
গ্যাস সংকট মোকাবিলায় দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন ও গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দিচ্ছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে ১৫০টি কূপ খননের পাশাপাশি ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার ২ডি এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সাইসমিক সার্ভে পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সমুদ্রাঞ্চলের ২৬টি ব্লকে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়োগে গত ২৪ মে আন্তর্জাতিক বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে।
স্থলভাগে অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে ‘বাংলাদেশ অনশোর মডেল পিএসসি-২০২৬’ প্রণয়নের কাজও চলছে।
বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে প্রায় ৯৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।
মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন একটি ভাসমান এবং মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ডবেজ্ড এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চলছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুতুবজোমের টার্মিনাল থেকে ২০২৮ সালে এবং মাতারবাড়ীর টার্মিনাল থেকে ২০৩০ সালের ডিসেম্বর নাগাদ গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হবে।
পায়রা বা মোংলা বন্দর এলাকা অথবা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতাও যাচাই করা হচ্ছে।
ভোলার গ্যাসে শিল্পায়নের পরিকল্পনা:
ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্যাস নেটওয়ার্কে যুক্ত করতে অন্তত সাত বছর সময় লাগতে পারে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তাই গ্যাসটি স্থানীয়ভাবে ব্যবহার করে শিল্পকারখানা গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ভোলায় গ্যাসনির্ভর শিল্প স্থাপনের উদ্যোগের পাশাপাশি একটি সার কারখানা এবং ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে ইলেকট্রিক ট্রেনের পরিকল্পনা:
চট্টগ্রাম-ঢাকা করিডোরে ইলেকট্রিক ট্রেন চালুর লক্ষ্যে ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন স্থাপনের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর প্রকল্পের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ও সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করার উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। টঙ্গী-আখাউড়া এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম অংশের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশার কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে লাকসাম-চট্টগ্রাম প্রকল্পের প্রস্তাব অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং টঙ্গী-আখাউড়া প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন শেষ পর্যায়ে। পাঁচ বছরে সৌরচালিত পাম্প পাবেন কৃষকেরা:::: আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সেচকাজে ব্যবহৃত ডিজেলচালিত পানির পাম্পের পরিবর্তে কৃষকদের সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প দেওয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুতের স্টোরেজে ব্যবহৃত ব্যাটারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘লিথিয়াম ব্যাটারি স্থাপনের ক্ষেত্রে অর্থাৎ তৈরির ক্ষেত্রে যেসব কলকারখানা স্থাপিত হবে সেটিকে সরকার সব রকম সহযোগিতা দেবে। লিড ব্যাটারিতে এসিডের ব্যবহার হয়, যা পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। সে জন্য এটাকে নিরুৎসাহিত করতে চাইছি। ভবিষ্যতে আমাদের চিন্তাভাবনা থাকবে, রুফটপের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করতে হবে।’ পরিবেশ রক্ষায় ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ:::: পরিবেশ রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় সংসদ ভবনে সানিডেল স্কুলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের পরিবেশ সুন্দর ও সবুজ করতে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের উদ্যোগ নিয়েছি। এতে তোমাদেরও অংশগ্রহণ করা উচিত।
পরিবেশ ঠিক রাখতে তোমাদের বাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি তোমাদের আত্মীয়স্বজনদের বাসার আশপাশেও গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ) জানান, সংসদের কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের ধারণা দেওয়া এবং অধিবেশন প্রত্যক্ষ করার সুযোগ করে দিতে সানিডেলের শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদে গিয়েছিল।
এ ছাড়া মাঠ প্রশাসনকে আরও জনবান্ধব, স্বচ্ছ, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে নীতি ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের উদ্যোগ, চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নগরের অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়েও সংসদে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।