আ জা আন্তর্জাতিক ডেক্স
আন্তর্জাতিক বাজারে সস্তায় মিললেও বেশি দামে এবং বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মাথায় নিয়ে পাকিস্তান থেকে চাল আমদানির তোড়জোড় শুরু হয়েছে।
ঢাকাকে পাকিস্তানের কৃষিপণ্য, বিশেষ করে চাল রপ্তানির একটি নতুন ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ইসলামাবাদ তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা তীব্র করেছে বলে পাকিস্তানের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম 'এক্সপ্রেস ট্রিবিউন'-এর এক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
মূলত সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) চুক্তির মাধ্যমে এই চাল বাংলাদেশে পাঠাতে চায় পাকিস্তান সরকার।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব পাকিস্তানের (টিসিপি) চেয়ারম্যান আসিম আজিম সিদ্দিকীর নেতৃত্বে পাকিস্তানের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকা সফর সম্পন্ন করেছে।
সফরকালে প্রতিনিধিদলটি বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন এবং একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা করেন।
তবে এই চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, সম্ভাব্য এই চাল আমদানির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে দেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং অর্থনীতিবিদদের মধ্যে তীব্র সংশয় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি ও মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা:
খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ের স্পর্শকাতর তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, অতি সম্প্রতি ২০২৫ সালে পাকিস্তানের ১০৪টি চালের চালান জব্দ করে ফেরত পাঠায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
ওই চালগুলোতে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকর কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ (এমআরএল) পাওয়া গিয়েছিল। ক্ষতিকর কীটনাশকযুক্ত এই চাল আমদানির নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের প্রধান অধ্যাপক মো. সাইদুল আরেফিন বলেন:
"এমআরএলের মাত্রা বেশি থাকা চাল দীর্ঘদিন খেলে লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে পেটব্যথা, বমিসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।"
এই উদ্বেগের সাথে একমত পোষণ করে চিকিৎসক তুনাজিনা শাহরিন বলেন: "বিদেশ থেকে খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কঠোর পরীক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।"
তিনি দেশের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যেকোনো খাদ্যপণ্য ল্যাব টেস্টে যথাযথভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার আগে বন্দরে ছাড় না দেওয়ার জন্য জোর আহ্বান জানান।
সস্তা ভিয়েতনাম ছেড়ে কেন দামি পাকিস্তানি চাল...?
প্রস্তাবিত এই চুক্তির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও বড় ধরনের বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পূর্ববর্তী একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে বলা হয়েছে, গত বছর ভিয়েতনাম যেখানে প্রতি টন চাল ৪৭৪ মার্কিন ডলারে বাংলাদেশে সরবরাহ করার প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানে একই মানের চাল পাকিস্তান থেকে কিনতে প্রতি টনে ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৪৯৯ ডলার।
এতে রাষ্ট্রীয় তহবিলের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন: "আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক কম দামে একই ধরনের পণ্য পাওয়া গেলে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি দামে আমদানি করা হলে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।"
তিনি জাতীয় স্বার্থে যেকোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার চেয়ে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেন।
পাটের বাজার নিয়ে ধূম্রজাল:
যদিও এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, এই চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের বড় সুযোগ তৈরি হবে। তবে দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা এই আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না।
তাঁদের মতে, পাকিস্তানের বর্তমান ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ শিল্প পরিস্থিতি বিবেচনা করলে সেখানে বাংলাদেশের পাটের বড় বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সস্তা ও নিরাপদ উৎস অবহেলা করে পাকিস্তানের মতো উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ব্যয়বহুল দেশের সাথে চালের চুক্তি করার আগে বাণিজ্যিক সুবিধা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং জনস্বাস্থ্যের সুরক্ষার বিষয়টি চুলচেরা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।